পনেরো মাসে “পঞ্চপান্ডব”-এর ‘খাওয়া-দাওয়া’: ভুরিভোজ নাকি একাদশী!

শুরু করি কতকগুলো সংখ্যা-ত্রয়ী দিয়ে হঠাৎ করে দেখলে যেগুলোকে ত্রি-মাত্রিক স্থানাঙ্ক জ্যামিতির কথা মনে পড়তে পারে – (১,৭,১), (৮,৪,৩), (০,৫,৪), (১,১,০) ও (১,৬,১) – আর এই সংখ্যাগুলো আগামী মাস-দুয়েক অবধি এই রকমই থেকে যাবে। বুঝলেন কিছু? না, বোধহয়!

আচ্ছা, এই সংখ্যা-ত্রয়ীদের সঙ্গে জুড়ে দিই পাঁচটা দেশের নাম – অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত, নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তান। এবার বোধহয় কিছুটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে! যাচ্ছে কি? ঐ দেশগুলোর টেস্ট ম্যাচে জয়-পরাজয়-ড্র-এর কোন আংশিক হিসেব? উঁহুঃ, মোটেই  নয় – আরেকটা সূত্র দিই!

এবার পাঁচ ঝাঁক সংখ্যা দিই – এবার নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, নাহলে আপনি ভারতের কোটি কোটি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ক্রিকেট-প্রেমীদের দলে পড়েন কিনা সে বিষয়ে অনেকেই কিঞ্চিৎ সন্দেহ করবেন। 

১)    অস্ট্রেলিয়া    : ১৬ – ০ – ৮৭৩ – ৪৮.৩১

২)    ইংল্যান্ড    : ৩৯ – ১ – ২,০৬৬ – ৫৪.৩৭

৩)    ভারত        : ২৪ – ০ – ৭২৫ – ৩০.২১

৪)    নিউজিল্যান্ড    : ০৭ – ১ – ৩৯৫ – ৬৫.৮৩

৫)    পাকিস্তান    : ১৮ – ১ – ৮০৬ – ৪৭.৪১

[ছবি: লেখকের ব্যক্তিগত পুস্তক-সংগ্রহ থেকে]

দ্বিতীয় ও তৃতীয় লাইনের সংখ্যাগুলোর সঙ্গে জড়িত ছবিদুটো দেখেই আপনার ‘দিমাগ কি বাত্তি’ জ্বলে উঠেছে তো? আপনাদের মধ্যে কারো কারো হয়তো এই লেখকের প্রতি বেশ একটু উষ্মার উদয়ও হয়েছে! কি করি বলুন, বিগত পনেরো মাসের (২০২১-এর জানুয়ারি থেকে ২০২২-এর মার্চ) পাঁচজনের টেস্ট-ব্যাটিং পরিসংখ্যান তো এই কথাই জানাচ্ছে – স্টিভ স্মিথ, জো রুট, বিরাট কোহলি, কেন উইলিয়ামসন ও বাবর আজম – টেস্ট-ব্যাটিংয়ের এই “পঞ্চপান্ডব” কেমন ‘খাওয়া-দাওয়া’ করেছেন ঐ সময়কালে, সংখ্যা-ত্রয়ী ওঁদের প্রত্যেকের শতরান, অর্ধশতরান, শূন্যরান ইনিংসের সংখ্যা।

কেন অবশ্য এই সময়ে খুব কমই খেলেছেন, খানিকটা চোট-আঘাতের কারণেই। তবে তার মধ্যেই ক্রাইস্টচার্চে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটা দ্বিশতরানের ইনিংস (গতবছরের ৪ঠা-৫ই জানুয়ারি), এবং সাউদাম্পটনে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে দুটো অতি প্রয়োজনীয় ইনিংস খেলে দিয়েছেন। এই পনেরো মাসে দশটা টেস্টের মধ্যে কিউয়িরা জিতেছে পাঁচটা, হেরেছে তিনটে, ড্র দু’টো – তবে কেনের অধিনায়কত্বে পাঁচটা টেস্টের মধ্যে ফলাফল তিনটে জিত, শূন্য হার, দু’টো ড্র।

এই পনেরো মাসে দশটা টেস্টের মধ্যে ক্যাঙ্গারুরা জিতেছে পাঁচটা, হেরেছে একটা, ড্র চারটে। স্টিভ ধারাবাহিকভাবেই রান করে চলেছেন, সবচেয়ে কমসংখ্যক ইনিংস (১৫১) খেলে আট-হাজার রানেও পৌঁছে গেলেন, কিন্তু বড় ইনিংস (পড়ুন শতরান) তাঁর ব্যাট থেকে শেষ এসেছে সিডনিতে ভারতের বিরুদ্ধে আজ থেকে প্রায় পনেরো মাস আগে, গতবছরের ৮ই জানুয়ারি। বড় ইনিংস খেলার জন্য বিখ্যাত স্টিভ কি কোনও শারীরিক অসুবিধেয় পড়েছেন যা তাঁর বেশ-কিছুটা-অপ্রচলিত-অথচ-অত্যন্ত-কার্যকরী ব্যাটিং কলাকৌশলকে ব্যাহত করছে এবং তাঁর মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে?

এই পনেরো মাসে আঠারোটা টেস্টের মধ্যে ভারত জিতেছে দশটা, হেরেছে পাঁচটা, তিনটে ড্র – তবে বিরাটের অধিনায়কত্বে তেরোটা টেস্টের মধ্যে ফলাফল সাতটা জিত, পাঁচটা হার, একটা ড্র। কেমন জানি মনে হচ্ছে দক্ষিণ গোলার্ধবাসী টাসমান সমুদ্রপারের এই দুই প্রতিবেশী – কেন ও স্টিভ – যেন (অজ্ঞানে!) তাঁদের এই ভারতীয় ‘ব্যাটিং-ভ্রাতা’-র সঙ্গে ‘সহমর্মিতা’ প্রকাশ করবার চেষ্টা করছেন – বিরাটের ব্যাটে যে আঠাশ মাসেরও বেশি যাবৎ শতরানের দীর্ঘস্থায়ী খরা চলছে!

কেন এই খরা – কলাকৌশলের সূক্ষ্ম কোনও ফাঁক, নাকি আত্মবিশ্বাসের কিঞ্চিৎ অভাব, নাকি মনঃসংযোগের আচমকা ঘাটতি , নাকি সবকিছু মিলিয়ে – তা নিয়ে বহু আলোচনা-লেখালিখি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে, কিন্তু ‘শতকের একাদশী’ এখনও কাটেনি এবং তা চলবে আরো অন্তত মাস দুয়েক। ইতিমধ্যে আই.পি.এল প্রতিযোগিতাই তাঁর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার মঞ্চ হোক, এটাই সবার কাম্য।

এই পনেরো মাসে বারোটা টেস্টের মধ্যে পাকিস্তান জিতেছে সাতটা, হেরেছে তিনটে, ড্র দু’টো। আর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের ওয়াঘা-পারের প্রতিবেশী দলনায়ক বাবর ক্রমশ আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন। সম্প্রতি একটা অসাধারণ ম্যাচ-বাঁচানো চতুর্থ ইনিংস খেলেছেন স্টার্ক-কামিন্স-লিয়ঁ এই শক্তিশালী বোলার-ত্রয়ীর বিরুদ্ধে। বিগত বারোটা ইনিংসে তাঁর একটা শতরান (প্রায়-দ্বিশতরান) ও পাঁচটা অর্ধশতরান। 

যদিও রান-তাড়া-করা ম্যাচ-জেতানো বড় ইনিংস বাবর এখনও তেমন খেলেননি, এই কথা উঠতেই পারে, বিশেষত বাকি চারজনের সঙ্গে তুলনা করলে। এর মধ্যে তিনি আবার এই ‘শতকের একাদশী’ কালে নিজের ঘরের মাঠে তিন ম্যাচে প্রায় চারশো রানের ‘ভুরিভোজ’ খেয়ে কিছু ভারতীয় সমর্থকের অস্বস্তি একটু যেন বাাড়িয়ে দিয়েছেন!

এই পনেরো মাসে কুড়িটা টেস্টের মধ্যে ইংল্যান্ড দল জিতেছে চারটে, হেরেছে দশটা, ড্র পাঁচটা – বাকি ম্যাচটাতেও (ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে) হারের সম্ভাবনাই খুব বেশি। সবকটা টেস্টেই অধিনায়ক জো কিন্তু ব্যাট হাতে ধারাবাহিকভাবে রান করেই চলেছেন – আটটা শতরান এবং চারটে অর্ধশতরান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে দু’টো দ্বিশতরান ও একটা ‘ড্যাডি হান্ড্রেড’ (১৮৬), দেশের মাঠে ভারতের বিরুদ্ধে তিনটে শতরান যার একটা ‘ড্যাডি হান্ড্রেড’ (১৮০ নট আউট), ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঠে দু’টো শতরান যার একটা প্রায় ‘ড্যাডি হান্ড্রেড’ (১৫৩)।

অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার মাঠে অ্যাশেজ সিরিজে জো-র ‘ব্যাটিং ব্যর্থতা’ (১০ ইনিংসে ৩২২, তিনটে অর্ধশতক সমেত) ইংল্যান্ডকে ০-৪ হারতে বাধ্য করেছে, কারণ দলের বাদবাকি ব্যাটিং নড়বড়ে ছিল, স্টোকস-বাটলার-বেয়ারস্টো-মালান থাকা সত্ত্বেও। ওয়েস্ট ইন্ডিজে রিচার্ডস-বথাম ট্রফিতেও হারবার সম্ভাবনাই বেশি (যদিও স্টোকস-বেয়ারস্টো এ যাত্রায় ভালই করেছেন) তার একটা কারণ হয়ত তৃতীয়-তথা-শেষ টেস্টে ব্যাটার জো দু’ইনিংসেই ব্যর্থ।

তাহলে ‘অধিনায়কত্বের চাপ’, দলের (তুলনামূলকভাবে) দুর্বল ব্যাটিং, ম্যাচ / সিরিজ হারের বোঝা, এগুলোর কোনটাই কি জো-এর ব্যাটিংয়ের ওপর তেমন প্রভাব ফেলছেনা? সাম্প্রতিক টেস্ট-ক্রিকেটের রানের ‘ভুরিভোজ’ আসরে “রান কি বাজি জিতা ম্যাচ হার কর” সেই “বাজিগর” কি তাহলে জোসেফ এডওয়ার্ড রুট?? “হার কর জিতনেওয়ালে কো” তো তাই বলেছিলেন না ‘বলিউডের বাদশা’!